তেওতিওয়াকান: প্রাচীন ও রহস্যময় পিরামিডের শহরে একদিন

মেক্সিকো সিটির হোটেল হিল্টন রিফর্মা থেকে যখন আমাদের নিয়ে ট্যুারিস্ট বাসটি রওনা হলো তখন সকাল ৭টা। গন্তব্য, শহর থেকে ৪৮ কি.মি. দূরে প্রথম শতাব্দীর প্রথমভাগে গোড়াপত্তন হওয়া প্রাচীন ও সেসময় ম্যাসোআমেরিকার সবচেয়ে বড় নগরী তেওতিওয়াকান। প্রায় ১ ঘন্টা পর আমরা পিরামিডের শহরে এসে হাজির হলাম। গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই কানে আসলো ভরাট ও পাশবিক একধরণের আওয়াজ যা মহূর্তেই রক্ত ঠান্ডা করে দিল!

গেটের দুপাশেই মেক্সিকোর হরেক-রকম ঐতিহ্য সম্বলিত জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। জাগুয়ারসদ্যৃশ ছোট ছোট বাঁশির এক মাথায় মুখ লাগিয়ে তারাই এমন বিকট হৃদকম্পিত শব্দ সৃষ্টি করছেন ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। শব্দের উৎস আবিষ্কারের পর এবার প্রবেশ করালাম ৮৩ বর্গ কি.মি. এলাকাজুড়ে অবস্থিত ‘তেওতিওয়াকান’ বা ‘সিটি অব দ্য গডস’ -এ।


বর্তমান ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট প্রাচীন এই নগরীটি মূলত বিখ্যাত, দুটি পিরামিডের জন্য ‘পিরামিড অব দ্য সান’ ও ‘পিরামিড অব দ্য মুন’। এই দুই পিরামিডের মাঝখানে রয়েছে একটি প্রশস্থ রাস্তা যা ‘অ্যাভিনিউ অব দ্য ডেড’ নামে পরিচিত। এই দুটি পিরামিড ছাড়াও পুরো শহর জুড়ে রয়েছে আরও প্রায় ছোট বড় ২০০টি পিরামিড। এই শহরটি কে বা কোন সভ্যতা কখন গোড়াপত্তন করেছিলো তা এখনো রহস্যই রয়ে গেছে। ইতিহাস ঘেঁটে যেসব নথিপত্র পাওয়া যায় তার সবগুলোতেই মূলত অ্যাজটেকদের এই শহরের বাসিন্দা হিসেবে মনে করা হয় তবে এটা নিশ্চিত যে অ্যাজটেকরাও শহরটির গোড়াপত্তন করেনি। অ্যাজটেক সম্রাজ্যের ১০০০ বছর পূর্বেই শহরটি গোড়াপত্তন হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। লেজেন্ড অনুসারে, মহাপরাক্রমশালী অ্যাজটেক জাতির কোন এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে এই শহরটি সম্পর্কে ধারণা পান ও পরবর্তিতে একদিন সত্যি সত্যিই তারা শহরটি আবিষ্কার করে ও বসবাস করতে শুরু করে। তাহলে নিশ্চিতভাবেই প্রশ্ন থেকে যায় কে বা কারা এই বিশাল শহরটি তৈরি করেছিলো।

                                 অ্যাভিনিউ অব দ্য ডেড!

প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, তেওতিওয়াকান সেসময় ছিলো আইসোলেটেড একটি স্থান যার চারপাশে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়গিরি ছিলো। কোন একটি জাতি আগ্নেয়গিরির পাদদেশে বসবাস করতো যারা হঠাৎই লাভা উদগিরন হওয়া শরু হওয়ায় তাদের আবাসস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তিতে তারা ‍কিছুটা দূরে তেওতিওয়াকানে এসে বসবাস শুরু করে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, তারা আগ্নেয়গিরির পাহাড়ের চাইতেও বড় স্থাপনা তৈরি শুরু করে। পৃথিবীর অন্য পিরামিডগুলোতে যেমন শ্রমিকদের দুঃখের কাহিনী জড়িত এই শহরের পিরামিডগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি পুরোই ভিন্ন। বরং তারা স্বেচ্ছায় ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য হিসেবে এই পিরামিডগুলো তৈরি করেন। তারপরও সম্প্রতি পিরামিডের অভ্যন্তরে বেশ কিছু গুহার সন্ধান পাওয়া যায় যেগুলো মূলত নরবলি সংক্রান্ত ধর্মীয় আচার ব্যবহারে ব্যবহার করা হতো বলে বিশ্বাস করা হয়।

                              প্রাচীন শহরের বিভিন্ন স্থাপনা।

পুরো শহরের স্ট্রাকচার দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধরণা করেন, সেখানে সামাজিক ক্লাস বিদ্যমান ছিলো ও শহরের বিভিন্ন অংশে স্থানীয় ভিন্ন ভিন্ন উপাসহালয়েরও প্রমাণ পাওয়া যায়। অনুমানিক হিসেব অনুসারে শহরের বাদিন্দা ছিলো ১৫০০০০ থেকে ২০০০০০ জন। প্রাচীন শহরটির অধিকাংশ স্থানই এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ধারণা করা হয়, এখনো মাটির নিচে শহরটির ৫০% অংশ রয়ে গেছে। বর্তমান খননকাজগুলো মূলত করা হচ্ছে মর্ডান শহরের আশেপাশে ও পিরামিডগুলোর অভ্যন্তরে গুপ্ত চেম্বার ও মমির খুঁজে। তবে মজার ব্যাপার হলো, অ্যাজটেকদের পূর্বে শহরটিতে বসবাসকারী সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। শহরের বিশাল বিশাল স্ট্রাকচার ব্যতীত তাদের লিখন পদ্ধতি বা শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পিরামিডগুলোর দেওয়ালেও লিপিবদ্ধ নেই। অ্যাজটেকরা যখন শহরটি আবিষ্কার করে তখন শহরটির নাম দেওয়া হয় ‘তেওতিওয়াকান’ যা তাদের কাছে পবিত্র শহর বা দেবতাদের শহর হিসেবে বিবেচিত ছিলো। তবে অ্যাজটেকরা বিশ্বাস করতো, টোলট্যাকরা (Toltec Empire) শহরটি তৈরি করেছিলো।

                                 পিরামিড অব দ্য মুন।

শহরের সবচেয়ে বড় দুটি পিরামিডের মধ্যে একটি হলো ‘পিরামিড অব দ্য মুন’। এটি উচ্চতায় পিরামিড অব দ্য সানের চেয়ে ছোট তবে পুরোনো। পিরামিডটির অভ্যন্তরে খননকাজের সময় প্রত্নতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেন বড় পিরামিডের স্ট্রকচারের ভিতর আরও বেশ কয়েকটি (৬টি) পিরামিড রয়েছে যা এমনভাবে তৈরি যে একটি পিরামিড অপরটিকে ঢেকে দিয়েছে। পিরামিড অব দ্য মুনের পাদদেশ থেকেই শুরু হয়েছে ‘অ্যাভিনিউ অব দ্য ডেড’ নামের প্রশস্থ একটি রাস্তা। ধরণা করা হয়, এই প্রশস্থ রাস্তাটি ও এর সামনের পিরামিডটি ‘তেওতিওয়াকানের গ্রেট গডেজ’-কে পূজা করার জন্য ব্যবহার করা হত। ১৯৯৯ সালে খননকাজের সময় এই পিরামিডের অভ্যন্তরে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ একটি কবরের সন্ধান পান ও এতে চারটি মানব কঙ্কাল ও বেশ কিছু পশু-পাখির কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। তাদের ধারণা অনুসারে, এখানে তাদের সমাহিত করা হয়েছিলো ১০০ AD থেকে ২০০ AD এর মধ্যে। এর পূর্বে ১৯৯৮ সালে একটি কবর আবিষ্কৃত হয় যেখানে একজন পুরুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, তাকে গ্রেট গডেজের সন্তুষ্টির জন্য বলি দেওয়া হয়েছিলো।

                               পিরামিড অব দ্য সান।

অত্যধিক উত্তেজনায় সিঁড়ি ছাড়াই পিরামিডে উঠার চেষ্ঠা। ছবিটি তুলেছেন, জিকু ভ্যান দিক।
প্রাচীন এই শহরটির সবচেয়ে বড় পিরামিড হলো ‘পিরামিড অব দ্য সান’। ৭১.১৭ মিটার উচ্চতার এই পিরামিডটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তমও বটে। পুরো পিরামিডে একেবারে উচ্চতম স্থানে উঠতে মুটামুটি ৫০০টি সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। প্রথমেই ‘পিরামিড অব দ্য মুন’-এর চুড়ায় উঠে ক্লান্ত হয়ে গেলেও রহস্যময় এই পিরামিডটির চুড়ায় উঠার লোভ সামলাতে পারিনি। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে চূড়ায় উঠার পর আশাপাশের অঞ্চলের পাহাড় ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মনটা মহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেলো। পিরামিডের চূড়ায় বড় বড় পাথরের বোল্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে বসেই বিশ্রাম নিয়ে ছবি তোলতে ব্যস্থ হয়ে গেলাম। পিরামিড অব দ্য সান নামটি অ্যাজটেকদের দেওয়া। পুরো স্ট্রাকচারটি একটি গুহার উপর তৈরি করা হয়েছে যেটিকে তৈরিকারীদের উপাসনালহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও গুহাটি আগ্নেয়গিরির একটি লাভাটিউব ছিলো বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। ২০০৪ সালে অভ্যন্তরের একটি কক্ষ থেকে ১২টি মমি ও কয়েকটি জীবজন্তুর সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়। ধরণা করা হয়, তাদেরকে পিরামিড তৈরির সময় দেবতাদের সন্তুষ্ট কারর উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়েছিলো।

                            পিরামিড অব দ্য সানের চূড়া থেকে।

                  পিরামিডের সিঁড়ির পাশ দিয়ে নকশা করা দেবতা।

প্রাচীন সভ্যতার জনপ্রিয় ও বড় এই তেওতিওয়াকান শহরটি ১০০০ বছর টিকে ছিলো এবং হঠাৎ করেই একসময় শহরটি আগুনে পুড়ে যায় ও আস্তে আস্তে শহরটি তার ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। কি ঘটেছিলো? অনেকে মনে করেন, শহরটি অন্য সভ্যতা কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিলো বা তদের নিজেদের মধ্যে আভ্যন্তরীন কোন্দল শুরু হয়েছিলো। তবে যে স্থাপনাগুলো আগুনে পুড়ে গিয়েছিলো সেগুলো মূলত শাসকগোষ্ঠীদের ভবন বলেই প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন। সে হিসেবে সবচেয়ে প্রচলিত তথ্য হলো, খুব সম্ভবত স্থানীয়রা বিদ্রোহ করে তাদের শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করে ও যোগ্য শাসকগোষ্ঠী না থাকায় শহরটি আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে শুরু করে। শহরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় কয়েক শতাব্দী থাকার পর অ্যাজটেকরা এখানে বসবাস করা শুরু করে। পুরো দিন প্রাচীন এই নগরীতে কাটিয়ে রাত ৮টায় আমরা হোটেলে ফিরেছিলাম।

তথ্যসূত্র ও চিত্র: উইকিপিডিয়া, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ও বেশ কিছু ডকুমেন্টরি। পোস্টের নির্বাচিত চিত্রটি ধারণ করেছেন হাছিব ভাই, একটি তুলেছেন জিকু ভ্যান দিক (উল্লেখ্য) ও বাকীগুলো আমি।

Comments

Leave a Reply